পানি কম পান করলে শরীরে কি কি সমস্যা দেখা দিতে পারে? চলুন বিস্তারিত জানা যাক - wizstudy


পানি আমাদের শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি উপাদান। পানিকে জীবনের সাথে তুলনা করে বলা হয় পানির অপর নাম জীবন। খাদ্যের ছয়টি উপাদানের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটি হচ্ছে পানি। বিজ্ঞানীদের মতে মানবদেহের শতকরা ৭০ ভাগই পানি।

বুঝতেই পারছেন পানি আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে পানি পান করা সকল প্রাণির জন্য অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তু আমরা কেউ কেউ পানি পানের প্রতি একটু বেশীই উদাসীন। সারাদিনে বড়জোর হয়তো ভাত খাবার পর এক দেড় গ্লাস পানি পান করি। কিন্তু ভাই সত্যি বলছি এই পানিতে আপনার বিপাক ক্রিয়াটুকু চলছে ঠিকই, শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ হচ্ছেনা।

আর প্রতিদিনের এই বদঅভ্যাস থেকে আমাদের শরীরে একটু একটু করে বাড়তে থাকে পানির ঘাটতি। ঘাটতি বাড়তে বাড়তে তা একসময় রূপ নেয় ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতায়। শুধু তাই নয় প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান না করলে আমাদের শরীরে আরও নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। চলুন জেনে নেয়া যাক সেই সমস্যাগুলো কি কি! যাতে করে আমরা যারা নিয়মিত পানি পানের প্রতি উদাসীন তারা যেন আরেকটু সতর্ক হতে পারি। 


পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান না করলে যেসব সমস্যা হতে পারে


পানিশূন্যতা

প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান না করলে সবার প্রথমেই আপনার যে সমস্যাটি হতে পারে তা হলো পানিশূন্যতা। পানিশূন্যতায় দেহে পানির অভাব যখন চরম পর্যায়ে পৌছায় তখন নানা সমস্যা দেখা দেয়। এর ফলে গাঢ় রঙ্গের প্রসাব, মাথা ঘোরা এবং বুকে ব্যথা অনুভব হয়। এর ফলে শিশু এবং বয়স্করা বেশিরভাগ সময় জ্বরে ভোগেন। পরবর্তীতে এসব রোগীরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন।


মাথাব্যথা 

মানুষ হিসেবে আমাদের সবারই কমবেশী মাথাব্যথা হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে এটি আমাদের জন্য বড় ধরনের সমস্যার কারণ নাও হতে পারে। কেউ কেউ মাথাব্যথার সমস্যা জন্মগতভাবে পেয়ে থাকেন মাথাব্যথার সাধারণ কারগুলোর মধ্যে আছে - অবসাদ, ক্লান্তি কিংবা দুশ্চিন্তা। 

কিন্তু আপনার মাথাব্যথার কারণটি যদি হয় পর্যাপ্ত পানির অভাব, তাহলে এটি আপনার জন্য হয়ে উঠতে পারে অনেক বড় একটি দুশ্চিন্তা। হ্যা একদম তাই। ডাক্তাররা এখন পর্যন্ত মাথাব্যথার শতাধিক কারণ খুজে বের করেছেন, তার মধ্যে একটি হচ্ছে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান না করা। নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান না করলে এটি আমাদের মাথাব্যথার অনেক বড় একটি কারণ হয়ে উঠতে পারে।


চোখে ঘোলা দেখা ও ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া

পর্যাপ্ত পরিমাণ পানির অভাবে শরীরের উপর যেমন প্রভাব পড়ে তেমনি এর প্রভাব পড়ে আমাদের চোখের উপরও। আমাদের চোখের প্রায় ৭৫ শতাংশই পানি।

প্রতিনিয়ত ধুলাবালি প্রবেশ করায় এই পানি শুকিয়ে যেতে থাকে। তখন শরীরের অভ্যন্তরে থাকা পানি আমাদের চোখের পানির চাহিদা পূরণ করে।

পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান না করলে আমাদের চোখে দেখা দিতে পারে "ড্রাই আই" বা চোখের  পানিশূন্যতার মতো সমস্যা। এছাড়া পানির অভাবে চোখ লাল হয়ে যায়। যারা চোখে লেন্স ব্যবহার করেন তাদের নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করা উচিৎ।


ক্ষুধাবোধের অসাম্য

অনেক সময় এমন হয় যে প্রকৃতপক্ষে আমাদের ক্ষিধে পায়না অথচ  ক্ষুধা অনুভূত হয়। এটি হয় ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতার জন্য। আর ডিহাইড্রেশন হয় পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান না করার কারণে। এ ধরনের সমস্যা হলে ক্ষুধা না পেলেও মস্তিষ্ক সঙ্কেত পাঠাতে শুরু করে এবং আমরা ভরপেটেও ক্ষুধা অনুভব করি। 



কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়া 

কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়ার পেছনে মূলত বয়স বৃদ্ধি ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনকেই দায়ী করা হয়। তবে কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়ার অনেক বড় একটি কারণ হলো প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান না করা। 

অন্ত্রে জমে থাকা মলকে বাইরে ঠেলে বের করার জন্য পর্যাপ্ত পানি না থাকলে কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। 



হজমশক্তির সমস্যা 

আমাদের বিপাক ক্রিয়ায় পানির ভূমিকা কতটুকু এটা আমাদের কারোই অজানা নয়। শরীরে পানির অভাবে বিপাক কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারেনা। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পানি পানের অনভ্যাসের কারণে আমাদের শরীরে হজমে নানা সমস্যা দেখা দেয়। 

পেট ভালোভাবে পরিষ্কার রাখার জন্য পর্যাপ্ত পানি পানের বিকল্প নেই। 



শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা হওয়া 

আমাদের শরীরের ভার্টিব্রা ও কার্টিলেজের ৮০ শতাংশই পানি । তাই পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান না করলে হাড়ে পানি শুষ্কতা দেখা দেয়, যা থেকে হাড়ে ব্যথা হতে পারে। এছাড়াও 

তরুণাস্থির জয়েন্টগুলো এবং হাড়ের সুরক্ষায় শতকরা ৮০ ভাগ পানির প্রয়োজন হয়। অন্যথায় পানি কম পান করলে শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা অনুভূত হয়।



পেশীর গঠন হ্রাস পাওয়া 


সুন্দর গঠনের জন্য মাংসপেশিকে অনেক পানি ধরে রাখতে হয়, তাই পর্যাপ্ত পরিমাণ না খেলে মাংসপেশি অনেকটা শুকিয়ে যায় এবং মাংসপেশি সঠিকভাবে গঠিত হতে পারেনা। তাই শরীরচর্চার পরে প্রচুর পানি পান করা এবং পানিযুক্ত খাবার খাওয়ার প্রয়োজন হয়। 


 

মাংসপেশিতে ব্যথা হওয়া 


আমাদের শরীরে থাকা বিভিন্ন ধরনের তরলকে বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে দিতে পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । কিন্তু পানির অভাব দেখা দিলে এই কাজ হয় রক্তের মাধ্যমে। ফলে পেশিতে রক্ত স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা দেরিতে পৌঁছায়, তখন পেশিতে ব্যথা হয়।

 


চামড়া শুকিয়ে যাওয়া 

পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান না করলে মানবদেহের ত্বক তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা হারায়। ত্বক আমাদের শরীরকে অভ্যন্তরীণ অংশগুলোকে চাদরের মতো ঢেকে রাখে এবং বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া  থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। কিন্তু পানি কম পান করলে ত্বকে পানিশূন্যতা দেখা দেয়, চামড়া শুকিয়ে যায় এবং তা ঠিকমতো কাজ করে না। এতে করে শরীর থেকে ঠিকমতো ঘাম নির্গত হয়না এবং শরীর থেকে দূষিত টক্সিন ও বেরিয়ে যেতে পারেনা। ফলে গোটা শরীরেই তার প্রভাব পড়ে।


মুখের ভেতর শুকিয়ে যাওয়া  ও দুর্গন্ধ হওয়া


ঠিকমতো পানি পান না করলে আমাদের শরীরে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন দেখা দেয়। ডিহাইড্রেশনের ফলে আমাদের মুখের ভেতর পর্যাপ্ত লালা নির্গত হতে পারেনা এবং শুকনো মুখে বাসা বাধে নানা ধরনের জীবাণু। মুখ থেকে নির্গত হওয়া লালারসে থাকে ব্যাকটেরিয়ারোধী উপাদান। যা মুখের দুর্গন্ধ রোধে সহায়তা করে। কিন্তু শুকনোমুখে এটি তৈরী হতে পারেনা বলে মুখে উৎকট গন্ধের সৃষ্টি হয়।


ক্লান্তি এবং অলস অনুভূতি হওয়া 

পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি না পান করলে যেকোন কাজে খুব দ্রুত ক্লান্তি চলে আসে। নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস দুটোই মেনে চলার পরও যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা না হয় তবে অবসাদ আপনাকে ঘিরে থাকবে , ইচ্ছা করবে সারাদিন বসে থাকতে কিংবা ঘুমাতে। এর কারণ হল, পানির অভাবে রক্ত ঘন হয়ে যায়, ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেন পৌঁছাতে হৃদযন্ত্রের বেশি পরিশ্রম করতে হয়।


রক্তচাপ কমে যাওয়া 



অতিরিক্ত ঘাম নির্গত হলে শরীরে পানি খরচ বেশি হয়। পর্যাপ্ত পানি পান না করলে এ অবস্থায় পানির ঘাটতি পূরণ করতে না পারলে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। রক্তচাপ কমে যাওয়ার ফলে মাথা ঝিমঝিম ভাব কিংবা বমি বমি ভাব হতে পারে। 


হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া ও শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া 




পর্যাপ্ত পানির অভাবে শরীরে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। এতে করে হৃদযন্ত্র স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত লয়ে চলতে শুরু করে। এই অবস্থায় পানি শূন্যতার মারাত্মক পর্যায়ে শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে শরীরে রক্তের পরিমাণ কমে যেতে পারে এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে।


শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া 

আমাদের দেহের ত্বক এবং দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গকে ঠাণ্ডা রাখতে কাজ করে শরীরের ভেতরের পানি। কাজেই পর্যাপ্ত পানি পান না করলে এই কাজগুলো সঠিকভাবে সম্পন্ন হতে পারে না। ফলে শরীরের তাপমাত্রা বাড়ে। এছাড়া মানব শরীরে কর্মশক্তি সরবরাহের জন্য ‘গ্লাইকোজেন’ নি:সরণ অত্যন্ত জরুরি।পানি শূন্যতার কারণে মানবদেহের যকৃত পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পায় না, ফলে ‘গ্লাইকোজেন’ নিঃসরণ হয় না। এতে করে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়।


কিডনিতে পাথর হওয়া 


প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান না করলে প্রসাব কম হবে, আর প্রসাব কম হলে বৃক্কে থাকা খনিজ উপাদানগুলো সঠিকভাবে নির্গত হতে পারবেনা এবং এগুলো একত্রিত হয়ে বৃক্কে পাথর তৈরি করবে। এক্ষেত্রে যারা কফি ও লবণ একটু বেশী মাত্রায় খান তাদের ক্ষেত্রে  পরিস্থিতি আরও জটিল হতে থাকবে। 


গ্যাস্ট্রিক এবং আলসার হওয়া



হজমে সাহায্য করার জন্য আমাদের পেটে শতকরা ৯৮ ভাগ পানি এবং ২ ভাগ সোডিয়াম বায়োকার্বেনেটের দরকার হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত পানি পানের অভাবে হজম প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়না । ফলে পরবর্তীতে গ্যাসের সমস্যা বেড়ে গিয়ে আলসার হতে পারে।


অকাল বার্ধক্য  

 মানবদেহের ত্বক যতদিন সতেজ থাকে ততদিন তাকে যৌবনদীপ্ত দেখায়। আমাদের শরীরের ত্বকসহ ভেতরের এবং বাইরের সকল অঙ্গ প্রতঙ্গ সতেজ রাখতে পানির ভূমিকা অনস্বীকার্য। পর্যাপ্ত পানি পান না করলে তার ছাপা পড়ে আমাদের ত্বকে, মুখে। এতে শরীরের চামড়া কুঁচকে যায়। ফলে মানুষকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশী বয়স্ক মনে হয়। 


ডাক্তাররা একজন সুস্থ মানুষকে প্রতিদিন কমপক্ষে ২ লিটার পানি পান করতে বলেন যা প্রায় ৭ থেকে ৮ গ্লাসের মতো। নিয়মিত পানি পান না করলে উপরে উল্লিখিত সমস্যাগুলো ছাড়াও জানা অজানা আরও নানা ধরনের সমস্যা আমাদের শরীরে দেখা দিতে পারে। শরীরের ভেতর বাসা বাধতে পারে অচেনা কোনো রোগ। তাই আসুন সময় থাকতে সতর্ক হই। পরিবারের অন্যদেরকেও সতর্ক করি। সুন্দর, সুস্থ - সবল একটি পরিবার গড়ে তুলি। আর্টিকেলটি সম্পর্পকে আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানিয়ে যাবেন এই  প্রত্যয় নিয়ে,সবার সুস্বাস্থ্য কামণায় আজ এখানেই শেষ করছি।

ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। নিয়মিত ব্লগ আপডেট পেতে ওয়েবসাইট সাবস্ক্রাইব করে  রাখুন। উইজস্টাডির সাথেই থাকুন। 

Post a Comment

Previous Post Next Post